মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

এক নজরে

খাদ্য বিভাগের ইতিবৃত্ত

 

          কুড়ি শতাব্দীর ত্রিশ ও চলিস্নশ দশকে অবিভক্ত বাংলা এক দারম্নন দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে। সেই সময়ে উড়িষ্যার খরা, ১৯৪২ সালের ঘুর্ণিঝড়, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের চুড়ামত্ম পর্যায়ে বিপস্নবীগণ কর্তৃক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিনষ্ট করায় খাদ্যশস্য পরিবহণে ব্যাঘাতকে এ জন্য দায়ী করা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ এ জন্য প্রধানতঃ দায়ী ছিল। বার্মা সীমামেত্ম জাপানী বাহিনীর অগ্রাভিযানে ইংরেজ বাহিনী যুদ্ধের পোড়ামাটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যানবাহন বিনষ্ট করে। যুদ্ধরত সেনাবাহিনীর জন্য কলিকাতা ও সন্নিহিত এলাকা থেকে খাদ্যশস্য সরিয়ে নেয়া হয়। এর সঙ্গে কালোবাজারি-মজুদদারী ইত্যাদির দরম্নন তৎকালিন বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। ১৯৪৩ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে দুর্ভিক্ষ মারাত্মক আকার ধারণ করে। কলিকাতা, হুগলি, মেদিনীপুর ও তৎসন্নিহিত এলাকায় অসংখ্য লোক অনাহারে মৃত্যুবরণ করতে থাকে। কঙ্কালসার মানুষের ভীড়ে শহরাঞ্চলে ভূতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হয়, খাদ্য উচ্ছিষ্ট নিয়ে মানুষ ও কুকুরের কাড়াকাড়ি চলে।

 

            এ সময় ভারতের ইংরেজ গভর্নর জেনারেল লিনথিনগো বিদায় নেন ও সে স্থলে লর্ড ওয়াভেল যোগ দেন। কিন্তু ঔপনৈবেশিক সরকার দুর্ভিক্ষ  নিবারনে তেমন কোন পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি। খোদ ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী উইনষ্টন চার্চিল মহাযুদ্ধে সমসত্ম শক্তি নিয়োগ করায় এদিকে দৃষ্টি দেয়ার সামান্য চেষ্টাই করেন। ইংরেজ ও ভারত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হয়ে আখতার হামিদ খান নামে এক আই.সি.এস. কর্মকর্তা (পরবর্তীতে কুমিলস্না বার্ড এর প্রতিষ্ঠাতা) চাকুরী থেকে পদত্যাগ করেন। দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় প্রদেশে শ্যামা প্রসাদ-ফজলুল হক মন্ত্রীসভার ব্যর্থতার দরম্নন ১৯৪৩ সালে সরকারের পতন ঘটে। খাজা নাজিমউদ্দিনের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বেসামরিক সরবরাহ মন্ত্রী নিয়োজিত হন। প্রাদেশিক সরকার দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় সমগ্র প্রদেশে কিছু ত্রাণ ব্যবস্থা চালু করে। খাদ্য ও ত্রাণ কমিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে সমবায় দোকান খোলে। স্থানে স্থানে লঙ্গরখানা খুলে দুর্ভিক্ষ পীড়িতদের বাঁচানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ততদিনে দুর্ভিক্ষের করালগ্রাস ৪৫ থেকে ৫০ লাখ মানুষের জীবন হরণ করে।

 

            ইংরেজ শাসনে কলকাতা ও তৎসংলগ্ন এলাকায় শিল্পের প্রুসার ঘটায় সেখানে খাদ্য ও জরম্নরী দ্রব্যাদি সরবরাহের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। ফলে সরকারীভাবে কিছু খাদ্যদ্রব্য, কাপড়, কেরোসিন তৈল, সিমেন্ট, কয়লা সরবরাহের ব্যবস্থা আগে থেকে নেয়া ছিল। মহকুমা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীনে এ বিতরণ ব্যবস্থা চালু হয়। এখন দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় জনবহুল শহরগুলোতে রেশনিং ব্যবস্থায় সকলকে খাদ্যদ্রব্য সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়।

 

            ১৯৪৩ সালে বেসামরিক সরবরাহ (Civil supply) নামে একটি বিভাগ সৃষ্টি করে জরম্নরী দ্রব্যাদি সরবরাহ ও তার মূল্য-নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব এ বিভাগের উপর ন্যসত্ম করা হয়। অল্পদিনের মধ্যে সিভিল সাপস্নাই বিভাগ পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো লাভ করে। সিভিল সাপ্লাই কমিশনার প্রধান নির্বাহী ও তার অধীন মহাপরিচালক ও পরিচালকগণ নীতি      বাসত্মবায়নকল্পে নিয়োজিত হন। এক সময় মহাপরিচালক খাদ্য, মহাপরিচালক যানবাহন ও মজুদ, মহাপরিচালক ভোগ্যপণ্য এবং মহাপরিচালক বাসত্মবায়ন ও জনসংযোগ নামে ৪ জন মহাপরিচালকের অধীন ১২ জন পরিচালক নিয়োজিত ছিলেন। মিঃ হ্যাজবার্নওয়েল (তাকে সিভিল সাপস্নাইয়ের জনক বলা হয়), সমর সেন (প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত), কবীর চৌধুরী, ইকবাল করিম ইত্যাদি প্রথিতযশা ব্যক্তিরা এসব পদে নিয়োজিত ছিলেন।

 

            কলকাতা সহ প্রদেশের গুরম্নত্বপূর্ণ শহরগুলোয় সকল নাগরিককে হ্রাসকৃত মূল্যে জরুরী প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহের জন্য ‘‘বিধিবদ্ধ রেশনিং’’ ব্যবস্থা চালু করা হয়। চাউল, ময়দা, ভোজ্য তেল, চিনি ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্য রেশন কার্ড এবং কয়লা, ঢেউ টিন, সুতা, কাপড়, কেরোসিন তেল ইত্যাদি পারমিট মারফত বিক্রি করা হতে থাকে। জরম্নরী দ্রব্যাদির সরবরাহ, মূল্য ও পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ কল্পে ‘‘বেঙ্গল রেশনিং আদেশ ১৯৪৩’’ জারী করা হয়। ১৯৪৪ সালে সংশোধিত রেশনিং ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে জরম্নরী দ্রব্যাদি সরবরাহ করা হতো।

 

 

            মাঠ পর্যায়ে জেলায় District Controller of Civil Supplies মহকুমায় Sub-Divisional Controller of Civil Supplies এবং থানা পর্যায়ে  Inspector, Civil Supplies  সরবরাহ কার্য বাসত্মবায়ন ও নিয়ন্ত্রণ করতেন।

            বেসরকারী পর্যায়ে Storing Agent (মজুদ প্রতিনিধি) নিয়োগ দিয়ে তাদের নিকট দ্রব্যাদি মজুদ রাখা হতো। সাধারণত: জেলা পর্যায়ে মজুদ প্রতিনিধি থাকত। এঁরা জেলার অবস্থাপন্ন ও সুনামের অধিকারী লোক হতেন। মজুদ প্রতিনিধির মজুদস্থল বা গুদামের District Storage Depot বলা হতো। জেলা ও মহকুমা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্তৃক ইস্যুকৃত সরবরাহ আদেশ ও পারমিট মারফত মালামাল বিক্রি হতো।

 

১৯৪৩ সালে বেসামরিক সরবরাহ বিভাগ মূলতঃ খাদ্যবস্ত্ত ও ভোগ্যপণ্য সরবরাহের উদ্দেশ্যে স্থাপিত হলেও অচিরেই খাদ্যশস্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। ১৯৪৫ সাল থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ শুরম্ন হয়। এ ব্যবস্থাধীনে প্রদেশের উদ্বৃত্ত এলাকায় কয়েকটি Region ( বর্তমান Region এর অনুরম্নপ নয়) প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং প্রত্যেক Region  এ একজন Regional Controller of Procurement কে উক্ত এলাকার সংগ্রহের দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়। প্রধান প্রধান সংগ্রহ এলাকায় (পূর্বতন বৃহত্তর জেলার অনুরম্নপ) Assistant Regional Controller of procurement বা Deputy Regional Controller Procurement  নিয়োজিত থাকতেন। মাঠ পর্যায়ে Assessor Inspector বা Store Keeper গুদামের দায়িত্বে থেকে সংগ্রহ কাজ চালাতেন। তার অধীনে একজন Junior Accountant থাকত। সংগ্রহ কার্যে সহায়তার জন্য Cordoning Officer ও  Patrol Officer কার্যরত থাকত; সংগ্রহের প্রয়োজনে তারা এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় খাদ্যশস্য গমনে বাধা দিত অনেক সময় কৃষকের উপর বাধ্যতামূলক Levy ( নির্দ্দিষ্ট পরিমাণ ধান) ধার্য করত। সংগ্রহ কাজ সফল ভাবে পরিচালনার জন্য এক সময় The East Pakistan Cordoning Order- ১৯৫৮ আদেশ জারী ছিল।

 

সংগৃহীত খাদ্যশস্য (প্রধানত:ধান) সংরক্ষণের প্রয়োজন দেখা দেওয়ায় প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থা অনুযায়ী নানা ধরণের সরকারী গুদাম নির্মাণ করা হয়। লাহোর শেড, কলিকাতা টাইপ, আসাম টাইপ, টুইন নিশান এদের মধ্যে উলেস্নখযোগ্য। সংগ্রহ স্থলকে  Procruement Center এবং গুদামকে Main Procurement Godown বলা হতো। সংগৃহীত ধান বেসরকারী মিল (শুধু  Major Mill) মারফত ছাঁটাই করিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা চালু করা হয়।

 

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তি ও পাকিসত্মান প্রতিষ্ঠার পর সিভিল সাপস্নাই বিভাগ পূর্বের অবয়বে বহাল রাখা হয়। দেশের কয়েকটি প্রধান শহরে বিধিবদ্ধ রেশনিং ও দেশের সর্বত্র সংশোধিত রেশনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে জরম্নরী দ্রব্যাদি সরবরাহ চালু রাখা হয়। পরবর্তীতে ‘অতি জরম্নরী’ নামে একটি মাধ্যম চালু করে সেনাবাহিনী, পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী, হাসপাতাল ও রেলের কর্মচারীদের খাদ্য দ্রব্যাদি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়।  Essential Priority নামে শুধু সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে বিতরণের জন্যও একটি চ্যানেল খোলা হয়।

 

১৯৫১ সালে সরবরাহ ও সংগ্রহ বিভাগ একীভূত করে একক নিয়ন্ত্রণাধীনে আনা হয়। পূর্বে সরবরাহের জন্য ভিন্ন ও সংগ্রহের জন্য ভিন্ন কর্মকর্তা ও দপ্তর ছিল। প্রশাসনিক বিভাগে Regional Controller of Food জেলায় District Controller of Food এবং মহকুমায় Sub-Divisional Controller of Food নিয়োজিত হন।

 

            দেশে প্রচুর খাদ্যশস্য উৎপাদন ও খাদ্যশস্যের মূল্য স্থিতিশীল হয়ে এসেছে মনে করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের মূখ্য মন্ত্রী আবু হোসেন সরকারের নেতৃত্বের যুক্তফ্রন্ট সরকার ১৯৫৫-১৯৫৬ সালে পর্যায়ক্রমে সিভিল সাপস্নাই বিভাগ অবলুপ্ত করে। রাজনৈতিক ব্যক্তি ও তাদের প্রিয়ভাজনদের নিলাম ও পারমিটের মারফত হাজার হাজার মন খাদ্যশস্য নাম মাত্র মূল্যে সরবরাহ দিয়ে সরকারী গুদাম খালি করা হয়। জেলায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে খাদ্য বিভাগের কয়েকজন করণিক রেখে সিভিল সাপস্নাই বিভাগের সকল কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিদায় করে দেয়া হয়।

 

            অল্প দিনেই সিভিল সাপ্লাই বিভাগ বিলোপের কুফল দেখা দেয়। বাজারে খাদ্যশস্যের মূল্য অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যায়। মজুতদারদের কারচুপিতে অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। দেশে দুর্ভিক্ষাবস্থার সৃষ্টি হয়। রাজধানী ঢাকাসহ নানা স্থানে ভূখা মিছিল বের হলে তাতে গুলি চালানো হয়। অনশন ধর্মঘট ও বিশৃঙ্খলা চলতে থাকে। বাধ্য হয়ে সরকারকে আবার সরকারী মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহের সিদ্ধামত্ম গ্রহণ করতে হয়।

 

 

            ১৯৫৬ সালে তড়িঘড়ি করে সিভিল সাপস্নাই বিভাগের অবয়বে খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘‘খাদ্য বিভাগ’’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ছাঁটাইকৃত কর্মচারীদের ডেকে এনে এবং নতুন কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়। ঢেউটিন, কয়লা, কাপড় ইত্যাদি বাদ দিয়ে শুধু খাদ্য দ্রব্য সংগ্রহ ও সরবরাহের দায়িত্ব খাদ্য বিভাগের উপর ন্যসত্ম করা হয়। খাদ্য সংগ্রহ ও বিতরণ ব্যবস্থাকে আইনের আওতায় আনার জন্য The East Pakistan Controller of Essential Commodity Act. ১৯৫৬ এবং খাদ্য সংশিস্নষ্ট আইন ভঙ্গকারীকে শাস্তি দেয়ার জন্য The East Pakistan Food (Special Court) Act. ১৯৫৬ জারী করা হয়। ১৯৫৭ সালে খাদ্য বিভাগকে একটি স্থায়ী বিভাগে রম্নপামত্মরিত করা হয়।

 

            ১৯৬০ ও ১৯৭০ দশকে খাদ্য বিভাগের কর্মকান্ড অত্যমত্ম বিস্ত্তৃত ছিল। তখন বিভিন্ন রেশনিং চ্যানেলে খাদ্যদ্রব্য বিতরণ ছাড়াও এষ্টাবিলিশমেন্ট পারমিটের মাধ্যমে বেকারী, মিষ্টির দোকান, লজেন্স ফ্যাক্টরী ইত্যাদি ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানে চিনি, ময়দা, ভোজ্য তেল সরবরাহ দেওয়া হতো। এ ছাড়া বৈদেশিক সাহায্য হিসেবে প্রাপ্ত বিপুল গম-চাল পরিবহণ ও বিতরণে সব সময় ব্যসত্ম থাকতে হতো। কিন্তু সে সময় খাদ্য বিভাগে দক্ষ ও যোগ্য লোকের অভাব থাকায় নানা অনিয়ম সংঘটিত হয়। বিভিন্ন বিভাগ থেকে খাদ্য বিভাগে কর্মচারী কর্মকর্তা আত্নীকরণে অবস্থা আরও নাজুক হয়। প্রশাসন বিভাগ থেকে একটি নির্দিষ্ট কোটায় জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও পরিচালক পদে প্রেষণে নিয়োজিত থাকতেন। এ সময় কিছু অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারী কর্তৃক ভুয়া রেশন কার্ড ও পারমিট প্রদান, গুদামের মালামাল আত্নসাৎ ও রেল পরিবহণে বিপুল ঘাটতি সংঘটিত হয়। এতে খাদ্য বিভাগের সুনাম দারম্ননভাবে ক্ষুন্ন হয়।

            ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পূর্ব পর্যমত্ম মোটামুটি একইভাবে খাদ্য বিভাগের কার্যাদি চলে। স্বাধীনতার পর পূর্বের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সহ ‘‘খাদ্য ও সিভিল সাপ্লাই’’ নাম নিয়ে খাদ্য বিভাগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এবার খাদ্যসহ কয়েকটি ভোগ্যপণ্য সরবরাহের দায়িত্ব এর উপর বর্তায়।

 

            মুক্তিযুদ্ধে কৃষির বিপুল ক্ষতি, বিধ্বসত্ম যোগাযোগ ব্যবস্থা, আইন শৃঙ্খলার অবনতি, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে খাদ্য আমদানী ও বন্টনে ব্যাঘাত ইত্যাদির ফলশ্রুতিতে ১৯৭৪ সালে দেশে পুনরায় খাদ্যাভাব দেখা দেয়। খাদ্য দ্রব্যের মূল্য আকাশচুম্বী হয়ে মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। লঙ্গরখানা খোলা হয়, কিন্তু যথেষ্ট খাদ্যশস্য মজুত না থাকায় কাজের বিনিময়ে খাদ্য, ভিজিডি ইত্যাদি নতুন বিরতণ মাধ্যমসহ প্রচলিত মাধ্যমে খাদ্যশস্য বিতরণ বিঘ্নিত হয়। ফলে বৃহত্তর রংপুরসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেয়। দেশের এমন পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ এর জানুয়ারীতে The Emergency Power Ruls, ১৯৭৫ জারী করা হয় এবং তার আওতায় The Emergency  (Regulation of Ration Articles and Internal Procurement of Rice and Paddy) Order, ১৯৭৫ মারফত রেশন দ্রব্যাদি বিতরণ ও ধান চাল সংগ্রহের আইন তৈরী করে খাদ্য দ্রব্যের মূল্য ও সরবরাহ স্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হয়। এ আইনের ১৭(৪) ধারায় আইন লঙ্গনের শাসিত্ম মৃত্যুদন্ড রাখা হয়।

 

            দেশে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রেক্ষিতে ১৯৮৪ সালে খাদ্য বিভাগ পূনর্গঠন ও পূনর্বিন্যসত্ম করা হলে খাদ্য বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও কার্যপদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে খাদ্য বিভাগ পূনঃনামকরণ করে শুধু খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ ও বিতরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়। সদ্য মহকুমা থেকে উন্নীত জেলাগুলো খাদ্য বিভাগীয় কাজের গুরম্নত্ব অনুযায়ী তিন শ্রেণীতে ভাগ করে তদানুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী পদায়ন করা হয়। নবসৃষ্ট উপজেলাতে ২য় শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তা (Thana Food Officer) পোষ্টিং দিয়ে পূর্বের মহকুমা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের প্রায় সকল ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। খাদ্য গুদামগুলোকে ধারণক্ষমতা অনুযায়ী ৩ ভাগে বিন্যসত্ম করে তদানুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী পোষ্টিং দেয়া হয়। খাদ্য বিভাগের প্রধান দপ্তরকে খাদ্য পরিদপ্তরের স্থলে খাদ্য অধিদপ্তর নামকরণ করে পূর্বের ৫টির স্থলে ৭টি বিভাগে পূনর্গঠিত হয়।

 

পরবর্তীতে জাতিসংঘের  Food and Agriculture Organization (FAO) এর সহযোগীতায় ব্যাপক সমীক্ষার পর খাদ্য বিভাগের হিসাব ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়। নতুন ছকে হিসাব সংরক্ষণ হতে থাকে। এ ব্যবস্থা চালুর ফলে এখন সহজেই মাসিক লেনদেনের পূর্নাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়। কোন কোন স্থানে হিসাবের গরমিল বা আত্নসাতের ঘটনা ঘটলে দ্রম্নত তা সনাক্ত ও ব্যবস্থা নেয়া যায়।

           

            ১৯৭৪ পরবর্তী অদ্যাবধি খাদ্য পরিস্থিতির উন্নতি লক্ষ্য করা যায়। বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, খরা ইত্যাদির দরম্নণ খাদ্য ঘাটতি ঘটলেও এবং মূল্যসত্মরে যথেষ্ট ওঠা-নামা সময়োচিত বৈদেশিক সংগ্রহ ও সুষ্ঠু বিতরণ ব্যবস্থা চালু করায় অনেক দূর্যোগ এড়ানো সম্ভব হয়েছে। বিশ্ববাণিজ্য উদারীকরণ, খোলা বাজার অর্থনীতি প্রবর্তন ও খাদ্যশস্য উৎপাদন ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৯০ দশকে খাদ্য বিভাগের কার্যক্রম সংকুচিত হয়ে পড়ে। খাদ্যশস্যের আমদানী সিংহভাগ বেসরকারী খাতে সম্পন্ন হতে থাকে। বৈদেশিক খাদ্য সাহায্য কমতে কমতে যৎসামান্য পর্যায়ে আসে। ত্রাণখাত, বিশেষ জরম্নরী গ্রাহক, মাঝে মধ্যে খোলা বাজারে চাল গম বিতরণ ও ধান, চাল, গম সংগ্রহ ছাড়া খাদ্য বিভাগের তেমন কোন কার্যক্রম ছিলনা। অনেককে মত প্রকাশ করতে দেখা গেছে যে, খাদ্য বিভাগের আর কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। এ অবস্থায় খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারী  হ্রাস করার সিদ্ধামত্ম নেওয়া হয়। মঞ্জুরী পদ সাড়ে ১৩ হাজার থেকে সাড়ে ৮ হাজারে আনা হয়। ১৯৯৪ সালে প্রায় ২৫০০ কর্মকর্তা কর্মচারীকে ‘‘সোনালী করমর্দন’’ (Golden handshake) পন্থায় অবসরে পাঠান হয়।

 

            গত কয়েক বছরে বিশেষ করে ২০০৬-২০০৮ সালে তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খাদ্য দ্রব্যের মূল্য এমন অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যায় যে, নীতি নির্ধারকগণ হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন যে, সরকারী গুদামে খাদ্যশস্য মজুদ না থাকলে এবং মজুদকৃত খাদ্যশস্য বাজারে না ছাড়লে বাজারদর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। দেশের পরিবর্তনশীল জলবায়ু, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দূর্যোগ, রাজনীতিতে খাদ্যমূল্যের বিরাট প্রভাব ইত্যাদি কারণে দেশের সার্বিক খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সরকারী হসত্মক্ষেপ একামত্ম প্রয়োজন বিবেচনায় খাদ্য বিভাগের গুরম্নত্ব আবার বাড়তে শুরম্ন করেছে। বিতরণ, অভ্যমত্মরীণ ও বৈদেশিক সংগ্রহ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করে বাজারদর স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

 

            গত এক যুগে খাদ্য নিরাপত্তার উন্নতি সাধনে অনেক নূতন কার্যক্রম গৃহীত হয়েছে। খাদ্য বিভাগ ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগকে নিয়ে খাদ্য ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় পুনর্গঠন করা হয়েছে, ১৯৮৮ সালের জাতীয় খাদ্য নীতির অপূর্ণতা দুর করে জাতীয় খাদ্যনীতি- ২০০৬ জারী করা হয়েছে। দি বেঙ্গল রাইস মিল কন্ট্রোল অর্ডার ১৯৪৩ বাতিল করে চাউল কল নিয়ন্ত্রণ আদেশ-২০০৮ বাসত্মবায়িত করে চাউল কল মালিকদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মঙ্গার সময় খোলা বাজারে (ও.এম.এস) খাদ্যশস্য বিক্রয় ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।অতি সম্প্রতি ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের জন্য ফেয়ার প্রাইস রেশন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। মজুতদারী মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্যের কৃত্রিম সংকট রোধে ১৯৯৯ সালে বাতিলকৃত The East Bengal Foodstuff and Anti hoarding Order ১৯৫৩ এর অবয়বে ২০১১ সালে খাদ্যশস্য ও খাদ্য সামগ্রীর মজুদের পরিমাণ ও মেয়াদ নির্ধারণ করে দিয়ে আদেশ জারী করা হয়েছে। সেই সঙ্গে খাদ্যশস্য ও খাদ্য সামগ্রীর লাইসেন্স প্রথা পুনঃপ্রবর্তন করা হয়েছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের যুগামত্মকারী মহতি উদ্যোগ এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ক্ষুধামু্ক্ত দেশ গড়ার আত্মপ্রত্যয়ে ‘‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ; ক্ষুধা হবে নিরম্নদ্দেশ’’ শেস্নাগানকে সামনে রেখে ‘‘খাদ্য বান্ধব কর্মসূচীর’’ আওতায় সমগ্র বাংলাদেশে হতদরিদ্রদের জন্য ১০.০০ (দশ) টাকা কেজি দরে নির্ধারিত কার্ডের মাধ্যমে ভোক্তাপ্রতি প্রতি মাসে ৩০ (ত্রিশ) কেজি চাল বিক্রয় কার্যক্রম গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬খ্রিঃ তারিখে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারি উপজেলায় উদ্ভোধন করা হয়। এ কার্যক্রম বছরের মার্চ, এপ্রিল, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে চলবে। উক্ত কার্যক্রমের আওতায় পাবনা জেলায় এ পর্যমত্ম ৯৮,১৬৬ জন কার্ডধারীর মাঝে ১৭,৪৪৪.০০০ মে.টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।   শহরাঞ্চলে দরিদ্র ভোক্তা সাধারণের খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করণে ওএমএস কার্যক্রমের আওতায় শুক্রবার বাদে সপ্তাহে বাকি ০৬(ছয়) দিন প্রতি কেজি ১৭/- টাকা দরে ভোক্তা প্রতি সর্বোচ্চ ০৫(পাঁচ) কেজি আটা বিক্রয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

 

            খাদ্যভিত্তিক বিভিন্ন সরকারী কার্যক্রম পরিচালনা ও আপদকালীন জরুরী প্রয়োজন মেটানোর জন্য সবসময় ৮ থেকে ১০ লক্ষ টন খাদ্যশস্য সরকারী গুদামে মজুদ রাখার জন্য জাতীয় খাদ্যনীতিতে সিদ্ধামত্ম রাখা হয়েছে। বর্তমানে দেশে সরকারী গুদামসমূহের ধারণক্ষমতা প্রায় ২০ লক্ষ টন হলেও কার্যকরী ধারণক্ষমতা সাড়ে ছাবিবশ লাখ টন। সংগ্রহ মৌসুমে মজুদ বৃদ্ধি পায়। এজন্য নতুন নতুন খাদ্য গুদাম নির্মাণ করে ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। খাদ্য বিভাগের কর্মচারী স্থাপনাতেও অনেক বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদকে প্রথম শ্রেণীর ও খাদ্য পরিদর্শকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর গেজেটেড পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বেতন স্কেল উন্নত করা হয়েছে। কম্পিউটার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে চলেছে। শূণ্য পদে নতুন জনবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। নতুন নিয়োগ ও পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে।

 

            জনবলের দিক দিয়ে খাদ্য বিভাগের অবয়ব ছোট হলেও এ বিভাগের কর্মকান্ড খুব স্পর্শকাতর ও অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ। দেশের খাদ্য পরিস্থিতির স্বাভাবিক রাখার উপর এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।

            

ছবি


সংযুক্তি


সংযুক্তি (একাধিক)



Share with :

Facebook Twitter